প্রজন্ম 24 ডেস্ক:
প্রকৃতিক ছবি
ছবি: সংগৃহীত
২০২৫ সালে সারাদেশে ৪০৩ জন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছেন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি স্কুল শিক্ষার্থী, ১৯০ জন (৪৭.৪০ শতাংশ। আত্মহত্যা করা শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৬১ শতাংশ নারী শিক্ষার্থী। মোট শিক্ষার্থীর ৬৬.৫০ শতাংশের বয়স ১৩-১৯ বছর। এসব তথ্য আঁচল ফাউন্ডেশন কর্তৃক পরিচালিত সমীক্ষায় উঠে এসেছে।
শনিবার ‘শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যা: ক্রমবর্ধমান সংকট শীর্ষক সমীক্ষা’র এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। আঁচল ফাউন্ডেশন জানায়, দেশের শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য পরিস্থিতি নিয়ে ১০০টি স্থানীয় ও জাতীয় পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ পর্যালোচনা করে প্রতি বছরের মতো ২০২৫ সালের পরিসংখ্যান তৈরি করা হয়েছে। তথ্যানুযায়ী গত বছর আত্মহত্যা করা ৪০৩ জনের মধ্যে ১৯০ জন স্কুল শিক্ষার্থী। এই চিত্র বিশেষভাবে উদ্বেগজনক, কারণ স্কুলগামী শিক্ষার্থীরা সাধারণত কৈশোরের সূচনালগ্নে থাকে, যখন মানসিক ও আবেগীয় বিকাশ অত্যন্ত সংবেদনশীল পর্যায়ে অবস্থান করে। কলেজ পর্যায়ে ৯২ জন বা ২২ দশমিক ৮ শতাংশ, বিশ্ববিদ্যালয়ে ৭৭ জন বা ১৯ দশমিক ১০ শতাংশ এবং মাদ্রাসায় ৪৪ জন বা ১০ দশমিক ৭২ শতাংশ শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছে।
লিঙ্গভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সর্বমোট ৪০৩ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে ২৪৯ জন বা ৬১.৮ শতাংশ নারী শিক্ষার্থী এবং ১৫৪ জন বা ৩৮.২ শতাংশ পুরুষ শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছেন। স্কুল ও কলেজ পর্যায়ে নারী শিক্ষার্থীর আত্মহত্যার হার পুরুষের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। স্কুলে ১৩৯ জন নারী ও ৫১ জন পুরুষ; কলেজে ৫০ জন নারী ও ৪২ জন পুরুষ আত্মহত্যা করেছে। তবে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে ভিন্ন চিত্র। ৪১ জন পুরুষের বিপরীতে ৩৬ জন নারী শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছেন। মাদ্রাসায় ২৪ জন নারী ও ২০ জন পুরুষ আত্মহত্যা করেছে।
কারণভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, হতাশা ২৭.৭৯ শতাংশ এবং অভিমানে ২৩.৩২ শতাংশ সবচেয়ে বড় দুটি কারণ হিসেবে উঠে এসেছে। হতাশার ক্ষেত্রে নারী ৬২ জন বা ৫৫.৩৫ শতাংশ ও পুরুষ ৫০ জন বা ৪৪.৬৫ শতাংশ, অভিমানে নারী ৫৮ জন বা ৬১.৭০ শতাংশ ও পুরুষ ৩৬ জন বা ৩৮.২৯ শতাংশ। একাডেমিক চাপে ৭২ জন আত্মহত্যা করেছে; যার অধিকাংশই স্কুল ও কলেজ পর্যায়ের শিক্ষার্থী; যেখানে নারী শিক্ষার্থীদের সংখ্যাই সর্বাধিক। এটা শতাংশের হিসেবে ৭০.৮৩ শতাংশ। প্রেমঘটিত কারণে ৫৩ জন বা ১৩.১৫ শতাংশ, পারিবারিক টানাপোড়েনে ৩২ জন বা ৭.৯৪ শতাংশ, মানসিক অস্থিতিশীলতায় ২৫ জন বা ৬.২০ শতাংশ এবং যৌন নির্যাতনের কারণে ১৪ জন বা ৩.৪৭ শতাংশ শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছে।
বিভাগভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ঢাকা বিভাগে সর্বোচ্চ ১১৮ জন বা ২৯.২৪ শতাংশ শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছে। চট্টগ্রামে ৬৩ জন বা ১৫.৬৩ শতাংশ, বরিশালে ৫৭ জন বা ১৪.৪ শতাংশ এবং রাজশাহী বিভাগে ৫০ জন তথা ১২.৪০ শতাংশ শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছে।
বয়সভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, ১৩-১৯ বছর বয়সী কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে আত্মহত্যার হার ৬৬.৫০ শতাংশ; যা মোট আত্মহননকারীদের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ। তাদের মধ্যে ১৯০ জন নারী ও ৭৮ জন পুরুষ। ২০-২৫ বছর বয়সীদের মধ্যে ২২.৬ শতাংশ শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছে; যেখানে পুরুষের সংখ্যা ৫১ এবং নারীর সংখ্যা ৪০। ১-১২ বছর বয়সী ৪৪ জন বা ১০.৯ শতাংশ শিশুর আত্মহত্যা করেছে।
বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে ৭৭ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে ৪৪ জন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের, ১৭ জন প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের, মেডিক্যাল কলেজের ৬ জন ও ১০ জন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় এবং বিভিন্ন অধিভুক্ত কলেজের শিক্ষার্থী।
১৯০ জন স্কুল শিক্ষার্থীর আত্মহত্যার ঘটনার বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সর্বোচ্চ ৩২.৬১ শতাংশ শিক্ষার্থী অভিমানের কারণে আত্মহত্যা করেছে। একাডেমিক চাপ ছিল দ্বিতীয় প্রধান কারণ; যা মোট ঘটনার ২৩.৬৯ শতাংশ। এছাড়া হতাশা থেকে আত্মহত্যা করেছে ১৯.৪৭ শতাংশ শিক্ষার্থী। প্রেমঘটিত কারণে আত্মহত্যার হার ৮.৯৫ শতাংশ এবং পারিবারিক টানাপোড়েনে ৮ দশমিক ৪২ শতাংশ। যৌন নির্যাতনের শিকার হয়ে ৪ দশমিক ২২ শতাংশ এবং মানসিক অস্থিতিশীলতার কারণে ২.৬৪ শতাংশ শিক্ষার্থী আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছে।
শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যা মোকাবেলায় আঁচল ফাউন্ডেশনের পাঁচ প্রস্তাবনা দিয়েছে। এগুলো হলোÑ সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে মনোসেবার এবং শিক্ষার্থীদের মেন্টাল হেলথ স্ক্রিনিংয়ের আওতায় আনা, শিক্ষার্থীদের মধ্যে মানসিক চাপ, বিষণ্নতা বা উদ্বেগের চিহ্ন শনাক্ত করতে শিক্ষক ও সহপাঠীদের প্রশিক্ষণ, আত্মহত্যা ও মানসিক সমস্যার ওপর সামাজিক স্টিগমা কমাতে সংবাদ, পোস্টার ও সামাজিক মাধ্যম প্রচারণা, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সাইকো সোশ্যাল প্রশিক্ষণের আওতায় আনা এবং অভিভাবকদের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের সংযোগ ঘটাতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে নিয়মিত মানসিক স্বাস্থ্য সচেতনতা বিষয়ক কর্মসূচির আয়োজন করা।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন- যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিসের কনসালট্যান্ট ফরেন্সিক সাইকিয়াট্রিস্ট ডা. আনিস আহমেদ, যুক্তরাষ্ট্রের মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. সৈয়দ মাহফুজুল আলম, টাঙ্গাইল মেডিক্যাল কলেজের সহকারী পরিচালক ডা. মারুফ আহমেদ খান, প্রোগ্রাম কো-অর্ডিনেটর সোহেল মামুন এবং আঁচল ফাউন্ডেশনের প্রেসিডেন্ট তানসেন রোজ।